Latest
Loading breaking news...

তিব্বতে ঢোকার ঠিক আগমুহূর্তে ছিলেন শুভশ্রী, এরপরই যোগাযোগবিচ্ছিন্ন

News Image
Photo: Archive

বুধবার ভোরে সুদীপ্ত ভট্টাচার্যের মুঠোফোনে স্ত্রীর কাছ থেকে একটি বার্তা আসে—পাসপোর্টে নেপালের প্রস্থান (ডিপারচার) স্ট্যাম্পের ছবিসহ। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫৭ মিনিটে শুভশ্রী চক্রবর্তী লিখেছিলেন, ‘আমরা চীনে ঢোকার অপেক্ষায় আছি।’ ঠিক ছয় মিনিট পর, সকাল ৮টা ৩ মিনিটে বার্তা আসা বন্ধ হয়ে যায়। এটিই ছিল স্ত্রীর সঙ্গে সুদীপ্তের শেষ যোগাযোগ।

৪৩ বছর বয়সী শুভশ্রী ও তাঁর ভ্রমণসঙ্গীরা তখন তিব্বতে ঢোকার অপেক্ষায় ছিলেন। এটি ছিল তাঁদের কৈলাস পর্বত তীর্থযাত্রার পরবর্তী ধাপ। হিমালয়ে অবস্থিত হিন্দু দেবতা শিবের পবিত্র আবাস কৈলাসে যাওয়ার বহু বছরের স্বপ্ন ছিল শুভশ্রীর।

নেপালের তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ২৯০ জন ভারতীয় নিখোঁজ হয়েছেন; শুভশ্রী তাঁদেরই একজন। নিখোঁজদের অনেকেই ছিলেন তীর্থযাত্রী। করোনা মহামারি ও পরে ভারত-চীনের উত্তেজনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত বছর থেকে আবার শুরু হয়েছে এই তীর্থযাত্রা। প্রতি বছর কয়েক হাজার ভারতীয় কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যান—বহু বছর ধরে এ ধারা চলে আসছে।

প্রায় ৩০ জনের একটি দলের অংশ হয়ে পরিবার ছাড়াই তীর্থযাত্রায় বেরিয়েছিলেন শুভশ্রী। শহুরে এক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা বিভাগে (আইসিইউ) মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করতেন তিনি; সিপিআর ও নিবিড় পরিচর্যার নিয়মকানুন জানা, শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন বলেও জানান তাঁর স্বামী। কিন্তু এসব কিছুই সুদীপ্তকে জানাতে পারেনি সেই শেষ বার্তার পর আসলে কী ঘটেছিল। ‘সকাল ৮টা ৩ মিনিটের পর কী হলো? আমরা কিছুই জানি না,’ বলেন তিনি।

নিখোঁজ হওয়ার আগে কাঠমান্ডু থেকে পাঠানো ছবিগুলোতেই বোঝা যায়, এই যাত্রা নিয়ে শুভশ্রী কতটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন—মন্দিরের কারুকার্যখচিত প্রাঙ্গণে নীল টিউনিকে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি, আবার লাল পোশাকে কাঠমান্ডু উপত্যকার ঐতিহাসিক দরবার স্কয়ারের প্রাচীন স্থাপত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা। সরকারি কর্মকর্তা সুদীপ্ত বলেন, ‘ও ভীষণ রোমাঞ্চিত ছিল, এটা ছিল ওর স্বপ্নের সফর।’

শুক্রবার (২১ আগস্ট) কলকাতা থেকে মিথিলা এক্সপ্রেসে রওনা হয়ে ২২ আগস্ট রক্সৌল পৌঁছান শুভশ্রী। এরপর সীমান্ত পেরিয়ে নেপালের বীরগঞ্জ হয়ে বাসে একই রাতে কাঠমান্ডু পৌঁছান তিনি। তিন দিন কাঠমান্ডুর দর্শনীয় স্থান ঘুরে ২৫ আগস্ট সকালে দলটি বাসে স্যাপ্রুবেসির উদ্দেশে রওনা হয়। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২২ কিলোমিটার উত্তরের পাহাড়ি এই ছোট্ট জনপদ ল্যাংটাং অঞ্চলের ট্রেকিংয়ের প্রধান প্রবেশদ্বার। প্রায় ১২ ঘণ্টার এই সফরে পাহাড়ধসে রাস্তা বন্ধ হয়ে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছিল; পরে সেনাবাহিনী রাস্তা পরিষ্কার করলে যান চলাচল শুরু হয়। সুদীপ্তকে ফোনে শুভশ্রী জানিয়েছিলেন, ‘আবহাওয়া ভালো আছে... আবহাওয়া গরম, তবে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে।’

পরদিন ২৬ আগস্ট সকাল ৭টার একটু পর হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়েন শুভশ্রী; প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি স্বামীকে জানান, নেপালের অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) প্রক্রিয়া শেষ এবং দলটি তিব্বতে ঢোকার অপেক্ষায়। নেপালের অভিবাসন শেষ করে পুণ্যার্থীরা হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে গিরংয়ে চীনের অভিবাসন কেন্দ্রে যান। সুদীপ্তের ধারণা, বিপর্যয়ের মুহূর্তে স্ত্রী চীনের অভিবাসন ভবনের ভেতরে বা কাছাকাছি ছিলেন—এরপরই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বেলা তিনটার দিকে সংবাদমাধ্যমে বন্যার খবর দেখে তিনি দলের অন্য পুণ্যার্থী, ট্যুর অপারেটর ও দুই ম্যানেজারকে কল করেন; কেউ সাড়া দেননি। ‘দয়া করে আমাকে চীন সরকারের কাছ থেকে একটা তালিকা এনে দিন—নিখোঁজ, মৃত এবং উদ্ধার হওয়াদের তালিকা। সর্বশেষ অবস্থা আমাদের জানা দরকার,’ বলেন তিনি। বিরহের এই অপেক্ষায় তিনি বলেন, ‘কী আর বলব বলুন? চোখের পাতা এক করতে পারছি না, সারাক্ষণ ফোনের পেছনেই কেটে যাচ্ছে।’

একই তীর্থযাত্রী দলের ৫৪ বছর বয়সী রীনা ব্যানার্জির পরিবারের জন্য অনিশ্চয়তা আরও বেশি—যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় তিনি সীমান্তের ঠিক কোন পাশে ছিলেন, তা-ও তাঁরা জানেন না। কলকাতার অবিবাহিত প্রাইভেট টিউটর রীনা এক ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে একা ভ্রমণ করছিলেন। ভাতিজা দ্বৈপায়ন মুখার্জি জানান, কাঠমান্ডুতে থাকাকালে ভিডিও কলে রীনা খুশি ছিলেন; ‘অনেক দিন পর তিনি কোনো ভ্রমণে বের হয়েছিলেন।’ পাহাড় তাঁর কাছে নতুন ছিল না—এর আগেও পাহাড়ে ঘুরেছেন, পরিবারের সঙ্গে হাইকিংয়ে গেছেন। পথে পাহাড়ধসে পুরো দলকে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে থাকার কথাও তিনি ভাতিজাকে জানিয়েছিলেন। পরদিন সকালে ট্যুর অপারেটরের পাঠানো গ্রুপ ছবিতে নেপাল অভিবাসন কেন্দ্রের সামনে দেখা যায় রীনাকে; তিনিও ডিপারচার স্ট্যাম্প পেয়েছিলেন। এরপরই নীরবতা। ‘তাঁরা চীনের অংশে ছিলেন নাকি নেপাল অংশে, আমরা এখনো সেটাই চিন্তা করছি,’ বলেন দ্বৈপায়ন।

নেপাল সরকারের ৫৩৭ জন নিখোঁজ মানুষের সরকারি তালিকায় এখন দুই নারীর নাম রয়েছে। কলকাতাভিত্তিক ওই ট্যুর অপারেটর জানিয়েছে, দলের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। দুই নারী কি শেষ পর্যন্ত সীমান্ত পার হতে পেরেছিলেন—দুই পরিবারের সামনে এখন থমকে আছে এই একটাই উত্তরহীন প্রশ্ন।

Read More