মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগদানে তাড়াহুড়া নয়, প্রয়োজন ঐকমত্য ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে, তবে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে নন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতির ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
আজ সোমবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান: কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব নিকাশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এমন মতামত উঠে আসে। ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোগে আয়োজিত সভায় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কূটনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সুযোগ ও ঝুঁকির হিসাব
ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, চুক্তিতে যোগ দিলে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সামরিক শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আন্তকার্যক্ষমতা (ইন্টারঅপারেবিলিটি) প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি যৌথ প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।
তবে ঝুঁকির দিকটিও তুলে ধরেন এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, বাংলাদেশ চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতকে সামরিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে নতুন করে হিসাবের মধ্যে রাখতে হতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান ভবিষ্যতে একই থাকবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। ৫৫ বছর ধরে নানা দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বন্ধুরাষ্ট্র নেই, যে নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়াবে — এমন বাস্তবতায় সমষ্টিগত নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আসা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে বিবেচনার বিষয় হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘হুজুগে’ যোগদান নয়
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী মনে করেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলেই বাংলাদেশের সব প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। দেশের মানুষ এ চুক্তির পক্ষে থাকলেও ‘হুজুগে হাইপ তুলে’ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। যোগ দেওয়ার আগে সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি নিয়ে যথাযথভাবে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকার এখনো পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করছে না বলেও মন্তব্য করেন এই সাবেক কূটনীতিক। জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার না করে মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিশ্লেষণ জরুরি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও ট্রাম্পের অভিনন্দনও গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক সিদ্দিকী মনে করেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে সংসদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা এবং জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি।
আর্টিকেল ৫ নিয়ে বিতর্ক
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আলোচনায় আসার পর থেকে বিরোধিতাকারীদের অনেকেই ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর উদাহরণ টানছেন। তাঁদের ভাষ্য, কোনো সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আক্রান্ত সদস্যকে সহায়তার জন্য অন্য সদস্যদের প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়।
তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে আর্টিকেল ৫ মূলত সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে সম্মিলিতভাবে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হবে, সেই কাঠামো নির্ধারণ করে। এতে কোনো দেশের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না। চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তিনি; তবে কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে তাঁর মত।
‘পরীক্ষা’
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক উপপ্রধান জন এফ ড্যানিলোউইজ মনে করেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিএনপি সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ কী হবে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তা স্পষ্ট হবে। তাঁদের দেখাতে হবে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে কীভাবে একটি বৃহৎ নীতিগত অবস্থান থেকে বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। আরও বক্তব্য দেন এফএসডিএসের মুখ্য গবেষণা ফেলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাফায়াত আহমেদ, মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, নেক্সাফ ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসান নাসির, সাংবাদিক ফয়সাল মাহমুদ, এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিন এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দিন হোসেন প্রমুখ।