দেয়ালে সাঁটানো মুখগুলো কি কখনো ঘরে ফিরবে
নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের দেয়ালে এখন সারি সারি নিখোঁজ মানুষের ছবি। কোথাও স্কুলের ইউনিফর্ম পরা এক কিশোরী, কোথাও গোলগাল গালের এক শিশু, আবার কোথাও বিয়ের দিনের হাসিমুখে এক দম্পতি। ছবিগুলোর নিচের আঠাও এখনো শুকায়নি, আর প্রতিটি ছবির নিচে একটিই আর্তি—এই মানুষটিকে কেউ দেখেছেন কি?
হিমবাহধসের কারণে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী ঢলে পুরো গ্রাম ভেসে যাওয়ার পর নিখোঁজ হাজারো মানুষের স্বজন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরছেন। রোগীদের তালিকায় পরিচিত কোনো নাম খুঁজছেন, পুলিশ ডেস্কে নিখোঁজ স্বজনের নাম লিখিয়ে দিচ্ছেন আর দেয়ালে সাঁটিয়ে দিচ্ছেন প্রিয় মানুষের ছবি।
নিখোঁজদের সন্ধানে মানুষের শেষ ভরসা
দুর্যোগ আঘাত হানার চার দিন পরও কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে স্বজনদের ভিড় কমেনি। প্রিয়জন বেঁচে আছেন—এ আশায় চিকিৎসাধীন শত শত আহত ব্যক্তির তালিকায় চোখ বুলিয়ে কেউ খুঁজছেন বাবা, কেউ সন্তান, কেউ স্বামী কিংবা ভাইকে।
নেপালের উত্তরাঞ্চলের দুর্যোগকবলিত রাসুয়া জেলার জায়দাদা গ্রামে থাকতেন ইয়াভরাজ লামার বোন, তাঁর স্বামী ও তাঁদের দুই সন্তান। পুরো গ্রাম ঢলের পানিতে ভেসে গেছে; সেই সময় থেকে নিখোঁজ লামার চার স্বজন। হাসপাতালের দেয়ালে এক বছর বয়সী শিশু সিজান তাওয়াংয়ের ছবি আঠা দিয়ে লাগানোর সময় চোখে পানি চলে আসে লামার। ছবিতে শিশু সিজান তার মায়ের কোলে, পাশেই সাঁটানো তার ১২ বছর বয়সী ভাই সাহিলের ছবি।
স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে লামা বলেন, ‘আমরা স্তব্ধ হয়ে গেছি। আমরা কতটা দুঃখিত ও বিধ্বস্ত, তা বলার মতো ভাষা নেই। আমাদের প্রধান লক্ষ্য এখন ছোট্ট সিজানকে খুঁজে বের করা। সে ছিল এত মিষ্টি আর নিষ্পাপ; সে আর আমাদের সঙ্গে নেই—এ কথা ভাবাও আমাদের পক্ষে অসম্ভব।’ একটু থেমে তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু তাদের পুরো গ্রামটাই হাওয়া হয়ে গেছে। তাই তাদের কেউ বেঁচে আছে, এমন কোনো আশাই আমাদের আর অবশিষ্ট নেই।’
পাশের দেয়ালে একটি ছবি সাঁটানোর সময় শোকে বিলাপ করছিলেন ২২ বছর বয়সী মনিতা নেপালি। ছবির মানুষটি তাঁর স্বামী বিশাল নেপালি, বয়স ৩০ বছর; মাত্র ছয় মাস আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। বিশাল নেপালি চালক হিসেবে কাজ করতেন এবং কাজের প্রয়োজনে তাঁকে প্রায়ই নেপাল–তিব্বত সীমান্ত এলাকায় যেতে হতো। দুর্যোগ আঘাত হানার এক ঘণ্টা আগে রাসুয়ায় সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন তিনি; সেদিন সন্ধ্যায় আবার ফোন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্ত্রীকে। কিন্তু এরপর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ। চার দিন কেটে গেলেও স্বামীর ফিরে আসার আশা ছাড়েননি মনিতা। তিনি বলেন, ‘ওকে ছাড়া আমি এ পৃথিবীতে বাঁচতে চাই না। আমার হৃদয় বলছে, সে ফিরে আসবে।’
কিছু পরিবারের জন্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ৩৬ বছর বয়সী তুলমায়া তামাং হাসপাতালে এসেছেন তাঁর পরিবারের ১২ সদস্যের কয়েকজনের ছবি নিয়ে; তাঁদের মধ্যে আছে তাঁর পাঁচ মাস বয়সী ভাতিজিও। সবাই রাসুয়ার একটি গ্রামে থাকতেন। তুলমায়া বলেন, ‘আমাদের পরিবার ভয়াবহ মানসিক চাপের মধ্যে আছে। এত মানুষ চলে গেছে, আর আমরা যারা বেঁচে আছি, তারাও সংগ্রাম করছি।’ স্বজনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা যখন ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে, তখন তাঁর চাওয়া বদলে গেছে। ‘আমরা যদি মরদেহগুলো পেতাম, তাহলে অন্তত শান্তি পেতাম। তা না হলে পরিবার কখনোই এ ভাবনা থেকে বের হতে পারবে না। এই যন্ত্রণা অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চলবে,’ বলেন তুলমায়া।
গত শনিবার সকাল পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। নেপালে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৭৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং সংখ্যাটি ক্রমেই বাড়ছে। দুর্গম বহু এলাকায় এখনো শুধু সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে; কাদামাটির নিচে আরও কত মানুষ চাপা পড়ে আছে, তা কেউ বলতে পারছেন না। চিতওয়ান শহরে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে মর্গগুলো, আর মৃতদেহ রাখার জন্য তৈরি করতে হয়েছে অস্থায়ী ভবন। প্রবল স্রোতে কিছু মরদেহ এত দূরে ভেসে গেছে যে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে প্রতিবেশী ভারত থেকে। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করাও এখন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
আটকে পড়া জলবিদ্যুৎ শ্রমিকেরা
নিখোঁজ মানুষের তালিকায় আছেন হিমালয়ের উঁচু এলাকায় ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর শ্রমিকেরাও। এসব প্রকল্পে কাজ করা অন্তত ৯০০ জন এখনো নিখোঁজ; তাঁদের অনেকেই কম মজুরির শ্রমিক, আর অন্তত ৬৩ জন ভারতের নাগরিক। কাদার স্রোতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২৮ আগস্টের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, নেপালি সেনারা ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গের ভেতর ঘন কাদা ভেদ করে জীবিত কয়েকজনকে উদ্ধার করছেন। নেপালের সেনাবাহিনীর ধারণা, অন্তত আরও ১০০ জন এখনো প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলোতে আটকা পড়ে আছেন। ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূগর্ভেও আরও কয়েক ডজন মানুষ আটকা পড়েছেন।
নিখোঁজদের একজন ২৪ বছর বয়সী সুজন নেপালি। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে রাতের শিফট শেষ করে বিছানায় ঘুমাচ্ছিলেন তিনি; এমন সময় পানির দেয়ালের মতো প্রবল স্রোত নেমে আসে উপত্যকা দিয়ে। তারপর থেকে তাঁর খোঁজ নেই। দুর্গত এলাকার যোগাযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে প্রতিদিন উদ্বেগ নিয়ে আসছেন সুজনের বোন সুশিশা মালুওয়ার। আহতদের তালিকায় ভাইয়ের নাম আছে কি না খুঁজে দেখছেন তিনি, হাসপাতালগুলোতে ভাইয়ের নাম লিখে দিচ্ছেন আর বিভিন্ন জায়গায় সাঁটিয়ে দিচ্ছেন ভাইয়ের ছবি।
চার দিন পরও আশা হারাননি সুশিশা। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা হারাইনি। হাসপাতালগুলোতে তাঁর নাম লিখে দিচ্ছি, সবখানে তাঁর ছবি সাঁটিয়ে দিচ্ছি। হয়তো কোথাও তাঁকে খুঁজে পাব। হয়তো তাঁকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। হয়তো তিনি পালিয়ে যেতে পেরেছেন। হয়তো এখনো বেঁচে আছে।’
একই আশায় হাসপাতালের দেয়ালে একের পর এক ছবি সাঁটানো হচ্ছে—কারও বাবা, কারও সন্তান, কারও সদ্য বিয়ে করা স্বামী, কারও ভাইয়ের খোঁজে। প্রতিটি ছবির পাশে অপেক্ষা করছে একেকটি পরিবার; কেউ বিশ্বাস করেন প্রিয় মানুষটি ফিরে আসবেন, আর কেউ শুধু অপেক্ষা করছেন—অন্তত একটি খবরের জন্য।