সর্বশেষ
Loading breaking news...

সকল বিভাগ

মোট 11 টি বিভাগ

নামাজের সেজদায় অন্য ভাষায় দোয়া করা যাবে কি?

খবরের ছবি
ছবি: সংরক্ষণাগার

নামাজের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ বয়ে আনে। এর মধ্যে সেজদার মুহূর্তটির মর্যাদা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সময় বান্দা সর্বোচ্চ বিনয় প্রকাশ করে মহান রবের সামনে মাথা নত করেন। ইসলামের বিধান অনুযায়ী এটি আল্লাহর কাছে দোয়া করার সর্বোত্তম সময়গুলোর একটি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “বান্দা সেজদারত অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে। অতএব, তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)

আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, “আর সেজদার সময় তোমরা বেশি বেশি দোয়া করার চেষ্টা করো, কারণ এ সময় তোমাদের দোয়া কবুল হওয়ার অধিক সম্ভাবনা রয়েছে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭৯)

সেজদায় মহানবীর দোয়া

সেজদারত অবস্থায় রাসুল (সা.) যে দোয়া করতেন, তার বহু বর্ণনা হাদিসের গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত আছে। তিনি সেজদায় এভাবে দোয়া করতেন—

“আল্লাহুম্মাগফির লি জামবি কুল্লাহু, দিক্কাহু ওয়া জিল্লাহু, ওয়া আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু।”

অর্থ: “হে আল্লাহ! আমার ছোট-বড়, প্রথম ও শেষ সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮৩)

নামাজের ভেতরে দোয়ার ভাষা: হানাফি মত

লক্ষণীয় বিষয় হলো, নবীজির এসব দোয়া সবই আরবি ভাষায় বর্ণিত এবং নির্দিষ্ট কাঠামোয় গঠিত। এ থেকেই হানাফি ফিকহবিদরা নামাজের ভেতরের দোয়ার ভাষা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই এই নামাজে মানুষের পারস্পরিক কথাবার্তার কোনো অবকাশ নেই। এটি তো কেবল আল্লাহর তাসবিহ, তাকবির এবং কোরআন তিলাওয়াতের জন্য।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৩৭)

এই হাদিসের আলোকে হানাফি ফকিহরা নামাজের মধ্যে এমন দোয়া থেকেও বিরত থাকতে বলেছেন, যার ভাষা ও কাঠামো সাধারণ মানুষের কথাবার্তার মতো — এমনকি তা আরবি হলেও। বিশেষ করে নিছক পার্থিব চাহিদা প্রকাশ করে এমন বাক্য সাধারণ মানুষের কথাবার্তার সাদৃশ্য বহন করে, তাই তা নামাজের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তাঁদের অভিমত।

বিশিষ্ট হানাফি ফকিহ ইবনে আবেদিন শামি (রহ.) লিখেছেন, “নামাজে আরবি ভাষায় দোয়া করবে, অনারবি ভাষায় দোয়া করা নিষিদ্ধ। কোরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত দোয়া করা যাবে, এমন বাক্য ব্যবহার করা যাবে না, যা সাধারণ মানুষের কথাবার্তার অনুরূপ।” (রদ্দুল মুহতার আলা দুররিল মুখতার, ২/২৩৩-২৩৭, দার আলামুল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)

অর্থাৎ হানাফি ফিকহে দুটি শর্ত একসঙ্গে বিবেচিত হয়:

  • ভাষা আরবি হতে হবে।
  • বিষয়বস্তু ও গঠন কোরআন-সুন্নাহর ভাবধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

অনারবি ভাষায় দোয়ার পক্ষের বক্তব্য

কেউ কেউ সেজদায় আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় দোয়া করার পক্ষে কয়েকটি হাদিস উপস্থাপন করেন। একটি হাদিসে রাসুল (সা.) আত্তাহিয়্যাতু পাঠের পর দোয়া করার সুযোগ দিয়ে বলেছেন, “এরপর সে নিজের পছন্দমতো যে দোয়াটি তার কাছে অধিক প্রিয়, তা বেছে নিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৩৫)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, “এরপর সে যা ইচ্ছা প্রার্থনা করতে পারে।” (সহিহুল জামে, হাদিস: ১৮৪৭)

এই বর্ণনাগুলো নামাজে দোয়ার বিষয়বস্তুর ব্যাপকতার নির্দেশ দেয়। কিন্তু এগুলোর কোথাও অনারবি ভাষায় দোয়া করার অনুমতির স্পষ্ট উল্লেখ নেই। তাই দোয়ার বিষয়বস্তুর ব্যাপকতাকে ভাষার স্বাধীনতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা স্বতঃসিদ্ধ নয়।

অনারবি ভাষায় দোয়ার অনুমোদনের পক্ষে যারা মত দেন, তাঁদের কাছে স্বাভাবিক প্রশ্ন — আরবি ভাষায় দক্ষতা না থাকা সাহাবি বা তাবেয়িদের মধ্যে কি সেজদায় অনারবি ভাষায় দোয়া করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়? নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থে এমন কোনো বর্ণনা নেই। ফলে শুধু “বেশি বেশি দোয়া করো” কিংবা “যা ইচ্ছা দোয়া করো” নির্দেশ থেকে অনারবি ভাষায় দোয়ার বৈধতা সাব্যস্ত হয় না।

আরবি দোয়া না জানলে করণীয়

কোনো ব্যক্তি আরবি দোয়া না জানলে নামাজের ভেতরে অনারবি ভাষায় দোয়া না করে নামাজের বাইরে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারেন। পাশাপাশি ধীরে ধীরে মাসনুন দোয়াগুলো অর্থসহ মুখস্থ করার চেষ্টা করা উচিত।

যেভাবে সুরা ফাতিহা, তাশাহহুদ ও প্রয়োজনীয় তাসবিহ শেখা হয়, সেভাবেই সেজদার কয়েকটি ছোট দোয়া অর্থসহ শেখা কঠিন কিছু নয়। এতে নামাজের সৌন্দর্য বাড়ে এবং মহানবীর সঙ্গে সম্পর্কও গভীর হয়। সেজদাকে কয়েকটি তাসবিহের শব্দে সীমাবদ্ধ না রেখে মাসনুন দোয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করাই উত্তম। আর ইবাদতের সৌন্দর্য পূর্ণতা পায়, যখন তা রাসুলের দেখানো পথ ও শরিয়তের নির্ধারিত সীমার ভেতরে সম্পন্ন হয়।

লেখক: ফয়জুল্লাহ রিয়াদ — শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

আরও পড়ুন